আন্তর্জাতিক ডেস্ক : শ্রমবাজারের জন্য নতুন দক্ষকর্মী দরকার জার্মানির। সেই সঙ্গে দরকার এমন ব্যবস্থাও যেন বিদেশি কর্মীরা শুধু আসবেনই না, দীর্ঘমেয়াদে বসবাসও করবেন। এক্ষেত্রে জার্মান কোম্পানি ও দক্ষ কর্মীদের সহায়তার জন্য নতুন একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জার্মানির মাঝারি আকারের একটি কোম্পানি ওমেক্সন হখস্পানুংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গুইদো সাইফেন। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন প্রস্তুতকারী কোম্পানিটির প্রায় ৫০০ কর্মী রয়েছে। তিনি জানান, জার্মানিতে ছড়িয়ে‑ছিটিয়ে থাকা নির্মাণ কেন্দ্রগুলোর জন্য দক্ষকর্মী খুঁজে পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
জার্মান‑ভিয়েতনামি উন্নয়ন সহযোগিতা প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এখন ভিয়েতনাম থেকে নতুন দক্ষকর্মী নিয়োগ করতে পারবেন এমন আশা করছেন। লাইন টেকনিশিয়ানের মতো জার্মানিতে এই খাতে যে ধরনের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন তা প্রস্তুত করতে ভিয়েতনামের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইভিএন একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেছে।
ওমেক্সমের পরিকল্পনা হলো ইভিএন‑এর ভিয়েতনামি প্রশিক্ষকদের জার্মানিতে এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যেন তারা জার্মান মানদণ্ড অনুযায়ী কর্মীদের প্রস্তুত করতে পারেন। এই প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড। ভিয়েতনামের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তারা প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য জার্মান ভাষা কোর্স চালু করছে। যারা প্রশিক্ষণ পাবে তাদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ ২০০ জনকে জার্মানিতে চাকরি দেওয়া যায়। এটি একটি ‘উইন‑উইন পরিস্থিতি’ বলে মন্তব্য করেন সাইফেন।
বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জার্মানিতে নিয়ে আসা, নিজ দেশে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং জ্ঞান বিনিময়ের এ ধরনের প্রকল্পগুলোকে সহায়তা দিতে চায় জার্মান ফেডারেল সরকারও৷ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয় এরইমধ্যে অংশীদারের সঙ্গে মিলে দক্ষ কর্মীদের প্রশিক্ষণে কাজ করছে। জার্মান শিল্পখাতকেও এতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে বিদেশি ‘দক্ষ কর্মীদের ন্যায়সংগত নিয়োগের’ জন্য একটি জোট গঠন করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘উই ফেয়ার অ্যালায়েন্স’।
বার্লিনে সম্প্রতি জোটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উন্নয়নমন্ত্রী রিম আলাবালি রাদোফান বলেন, ‘জার্মানির দক্ষ কর্মী দরকার’ তিনি জানান, জার্মানির ২০ শতাংশেরও বেশি কর্মচারীর বয়স কমপক্ষে ৫৫ বছর এবং তারা আগামী ১০ বছরের মধ্যে অবসর নেবেন।
জনমিতি গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ঘাটতি পূরণে আগামী এক দশকে বছরে চার লাখ বিদেশি দক্ষ কর্মী জার্মানিতে প্রয়োজন হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতি বছর জার্মানিতে প্রায় ১৬ লাখ মানুষকে অভিবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
রিম আলাবালি রাদোফান বলেন, ‘এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে দক্ষকর্মী নিয়োগ জার্মান অর্থনীতির জন্য ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।’ কেননা এসব দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ এবং উচ্চশিক্ষিত।
তিনি আরও বলেন, ‘এই দেশগুলোর বহু তরুণ তাদের নিজ দেশের বাইরে (কাজের) সুযোগ খোঁজেন। আর এসব দেশের সরকার আশা করে যে জার্মান ফেডারেল সরকার দক্ষ অভিবাসনের পথ তৈরি ও শক্তিশালী করবে।’
কিন্তু বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে জার্মানির কোম্পানিগুলোর যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই বলে মনে করেন কেউ কেউ। যেমন মিউনিখ অঞ্চলে অভিবাসীদের ‘ইন্টেগ্রেশন’ নিয়ে কাজ করা এডিথ অটিয়েন্ডে লাওয়ানি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই দেখি যে কোম্পানিগুলো ধরে নেয় তারা এমন একজন সম্পূর্ণ প্রশিক্ষিত কর্মী পাবে, যাকে তারা সঙ্গে সঙ্গে কাজে লাগাতে পারবে।’
কেনিয়ায় জন্ম নেওয়া এডিথ ‘গিভিং আফ্রিকা এ নিউ ফেস নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি আরও বলেন, ‘রূপকথার গল্পের মতো তারা মনে করেন যে মানুষ জার্মান ভাষা শিখে, দ্রুত ইন্টিগ্রেট হওয়ার যোগ্যতা এবং দৃঢ় মনোবল ও উদ্দীপনা নিয়ে জার্মানিতে আসবে। এখানে সবকিছুর সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নেবে।’ কিন্তু বাস্তবতা তা নয় এমনটাই মনে করে এডিথ।
এছাড়াও জার্মানিতে আসার জন্যেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিদেশি কর্মীদের জার্মানিতে এসে কাজে যোগ দিতে এমনকি কয়েক বছরও লেগে যায়। ন্যুরেমবুর্গ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্সের প্রধান নির্বাহী মার্কুস ল্যুৎশের কাছে এমন অনেক উদাহরণ আছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সংখ্যা অতিরিক্ত বেশি—এবং অভিবাসন দপ্তরগুলো, বিশেষত বড় শহরগুলোতে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে।
এমনকি ‘এক্সপ্রেস প্রক্রিয়া’ বলে পরিচিত ব্যবস্থাতেও হতাশার চিত্র রয়েছে বলে জানান তিনি। প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে তারা উদ্যোগ নিচ্ছেন, যেন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের প্রাথমিক কাজগুলো তারাই দেখভাল করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘অভিবাসন দপ্তর যখন জানবে যে নথিগুলো কোনো বিশ্বস্ত অংশীদারের কাছ থেকে এসেছে, তখন পরবর্তী ধাপগুলো আরও মসৃণভাবে সম্পন্ন হবে।’
ল্যুৎশে মনে করেন দক্ষ কর্মীরা জার্মানি আসছে কিনা তার পাশাপাশি আসার পরে তারা থাকছে কিনা সেই আলোচনাও দরকার। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো জার্মানিতে নতুন আসা মানুষের চেয়ে বেশি মানুষ দেশটি ছেড়ে গেছেন। অনেক বিদেশি দক্ষকর্মী জার্মানিতে তাদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন অথবা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন।
উদ্যোক্তা ইয়াসমিন আরবাবিয়ান‑ফোগেলের মতে, এর বড় একটি কারণ হলো অভিবাসীদের প্রতি জার্মানদের মনোভাব। জার্মানি এখনো বিদেশি দক্ষ কর্মীদের কাছে আকর্ষণীয় বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, ‘কিন্তু যদি আমরা আকর্ষণীয় থাকতে চাই, তাহলে আমরা এরই মধ্যে এখানে থাকা অভিবাসীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করি সরাসরি এই প্রশ্নটিও জড়িত।’
তার মতে, জার্মানিকে অভিবাসীদের প্রতি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মনোভাব গ্রহণ করতে হবে৷ তা না হলে দক্ষ‑কর্মী আকর্ষণে যে জোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা সফল হবে না। সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস